কোটরাখালির ভোরাই…

  • লেখা ও ছবি- সায়ন ভট্টাচার্য

সত্তর…… পঁচাত্তর…… আশি…… গুনতে গুনতে একশো হলেই মাটিতে একটা করে দাগ কেটে  রাখছে লোকটা। বড় সাইজের চামচ দিয়ে গুনে গুনে, একটা পাত্র থেকে অন্য একটা বড় পাত্রে তুলে  রাখছে। পাঁচশো… সাতশো… হাজার… লোকটা গুনেই চলেছে। কি অসীম ধৈর্য, একটাও এদিক ওদিক হওয়ার জো নেই। উঁকি দিলে চোখে পড়ে পাত্রের জলে সরু সরু কাঠির মত জিনিস ভাসছে। এক ইঞ্চির মত সাইজ। একটা কাঠির দাম এক টাকা। তাই এত যত্ন নিয়ে গুনে রাখা।  সকাল বিকেল এক করে খেটে সেগুলো নদী থেকে সংগ্রহ করা। ওগুলো বাগদা চিংড়ির মীন।

খুব খুব ভোরবেলা নদীর ধার তখনও ঝাপসা। বাঁধের ওপর এসে দাঁড়ালে কানে আসে ভটভটি আওয়াজ, দূরে আবছা দেখা যায় ইঁট বোঝাই নৌকাটাকে। নদীর ওপাড়ে এত ভোরেও কোথায় যেন বক্সে গান বাজছে। বাজনার শেষ টুকু ভেসে ভেসে আসছে। নদীর পাড়ে পাড়ে গ্রামের লোক বউরা কোমর জলে। যেন জলের তলায় ঠেলা গাড়ি চালাচ্ছে। ওরাই তো মীন ধরছে। ঘোলা জলের তলায়, মশারী কেটে বানানো জাল। ঠেলতে ঠেলতে এদিক থেকে সেদিক। কোমরে বাঁধা হাঁড়িতে জমা হচ্ছে জ্যান্ত কাঠি গুলো।  নদীতে, ভোরের চেয়েও আগে আসে ওরা।

আমাদের হোম স্টে, বাঁধের ঠিক গায়েই। কোটরাখালি গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে। ক্যানিং থেকে ২০কিমি। হসপিটাল মোড় ছাড়িয়ে এসে কলতলা বাজার থেকে বাঁহাতি পানিখালির রাস্তায় কিছুটা গিয়ে ডাইনে গেলেই কোটরাখালি। বাঁধের পাড় বরাবর রাস্তা ধরে গাড়ি সোজা চলে আসে হোম স্টের দোর গোড়ায়। অনেকটা এলাকা জুড়ে ছড়ানো জায়গা। গাছ পালা বাগান পুকুর ঘেরা ছোট্ট দুটো বাঁশের কটেজ। খুবই সাধারণ, কিন্তু তবুও অসাধারণ। নিভৃতে একলা নদীতে দিন যাপন। (যোগাযোগ -৯৮৩৬৮৩০৩৪২/ www.getlost.net.in)

বাইরে বেরোলেই উঁচু বাঁধ। সেখানে দাঁড়িয়ে ডাইনে বাঁয়ে চাইলে বোঝা যায় হানা নদীটার ব্যাপ্তি বিশাল।  বাঁধের ধারে বড় বড় কাঁটা ঝোপ। একটা দুটো বড় গাছ। কাক ডাকছে। মিঠে হাওয়া খুব। বড্ড শান্ত চারিপাশ। সূর্যের থেকেও আজ আগে উঠেছে শুভ্রা, ফাটা ফাটা বাঁধ ধরে হাঁটছে। আমি পিছু পিছু। বাঁধের ওপরে দাঁড়িয়ে কয়েকটা বাচ্ছা ছেলে মেয়ে। দাঁত মাজতে মাজতে থমকে থেমে আমাদের দেখছে। বাঁধের ডান দিকে হানা নদীকে সঙ্গে রেখে কিছুটা এগোলেই বাঁদিকে একটা মাছের ভেড়ি। আরও এগোলে নদীটা আস্তে আস্তে বাঁয়ে ঘুরেছে। নদীর সঙ্গে সঙ্গে বাঁধ রাস্তাও। রাস্তা নয়তো রাম্প, দুপাশে গুল্ম জাতীয় গাছ গাছালির শোভা। মডেল অবশ্যই শুভ্রা, হাঁসের মত তার রাম্প ওয়াক।  টিং টিং সাইকেলের ঘণ্টি। দাঁড়িয়ে যাই, চেয়ে থাকি যতক্ষণ না সাইকেলটা রাস্তাটায় ডুবে যায়। সূর্য এতক্ষণে উঠব উঠব করছে, সামনের আকাশটায় হলদেটে ভাব। এরপর মীন ধরে, গ্রামের বউগুলো যখন হাঁড়ি মাথায় নিয়ে বাঁধের ওপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে ফেরে, তখন তারাই সূর্যটাকে ঘুড়ির মত টেনে আকাশে তুলে দেয়।

মীন নিয়ে সবাই জড়ো হয়েছে ভেড়িটায়। সেখানে গুনতি করে পাওনা হিসেব বুঝে নেওয়া। হিসেবের মধ্যে আমি নেই, আমার থাকতে ইচ্ছা করে ভেড়ির জলে রোদ ঝলমল করা জলতরঙ্গে। বাঁধ থেকে একটা সরু আল পথ ভেড়ির বুক চিড়ে অনেকটা এগিয়ে গেছে। দেখতে পাই, সেই আলের একদম মাথায় দাঁড়িয়ে আছি আমি। ভেড়ির জলে ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ব্যাঙাচি করছি। ব্যাঙটা লাফ দিচ্ছে এক… তিন… সাত……। ঠাণ্ডা জলে রোদ এসে পড়ছে, সোনালি জল, হাওয়ায় হাওয়ায় চঞ্চল। চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিই বেশ করে। সমস্ত প্রাণীই প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে চায়। মানুষও তাই। সেই জন্যেই বার বার গ্রামে গঞ্জে পরশ খুঁজে ফেরা।

6 thoughts on “কোটরাখালির ভোরাই…

  • November 7, 2021 at 12:18 pm
    Permalink

    Darunnnnn..
    Lekha o chobi..
    Ullash Bhokatta 🥳🥳🥳🥳🥳

  • November 8, 2021 at 11:08 pm
    Permalink

    বাঃ ।জমে গেল

  • November 9, 2021 at 5:29 pm
    Permalink

    চমৎকার লাগলো।

  • November 10, 2021 at 11:24 am
    Permalink

    প্রিয় সায়ন,
    তোর লেখা পড়তে পড়তে ভোরের কটরাখালির আল ধরে আমিও যেন হেঁটে যাচ্ছিলাম, অনবদ্য লেখনী। অনেক ভালবাসা রইল।

Leave a Reply

Your email address will not be published.